বিশাল বপুদেহের ওজন কমাতে যা করবেন।

March 5, 2020 12:01 am0 commentsViews: 12

ডাঃ জাহাঙ্গীর কবির এর ডায়েট চার্ট

যারা শরীরের মেদ ও চর্বি কমিয়ে অতিরিক্ত ওজন কমাতে চাচ্ছেন তাদের ডায়েটিং, ব্যায়ামসহ নানান প্রচেষ্টার অন্ত নেই৷ কিন্তু সফলতার হার খুবই কম৷ এর সমাধানে বর্তমান সময়ে একটি ডায়েটিং পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে৷ মূলত সফলতার হার থেকেই এই জনপ্রিয়তা অর্জিত হয়েছে৷ যারা দীর্ঘদিন বিভিন্ন কসরত করেও এতটুকু ওজন কমাতে পারেননি তারা এই ডায়েট পদ্ধতি অনুরসণ করে অল্প সময়ে বেশ সফলতা অর্জন করেছেন৷ এ পদ্ধতিটির নাম ‘কিটো ডায়েট’ বা ‘কিটোজনিক ডায়েট’৷

কিটোজেনিক ডায়েট হল সুপার লো-কার্ব ডায়েট। এই ডায়েটে কার্ব এক্সট্রীম (extreme) লেভেলে কম থাকবে আর ফ্যাট অনেক হাই থাকবে আর প্রোটিন মিড লেভেলে (mid level) থাকবে। আমাদের নরমাল ডায়েটে ৫০% কার্বোহাইড্রেট থাকে, ২০% প্রোটিন আর ৩০% ফ্যাট থাকে। টিপিক্যাল কিটোজেনিক ডায়েটে টোটাল ক্যালোরিক নিডের কার্ব ৫%, প্রোটিন ২৫% আর ফ্যাট থাকে ৭০%। মানে আপনি সারাদিন যতটা খাবার খাবেন তার মধ্যে খাবারের পার্সেন্টেজ এমন হবে। এ জন্য আপনাকে জানতে হবে কোন কোন খাবারে কী পরিমাণ কার্ব, প্রোটিন, ফ্যাট ইত্যাদি থাকে৷

আপাতত মোটেও খাওয়া যাবে নাঃ

১) চালের তৈরি সব কিছু ( ভাত, চাউলের রুটি, চাল দিয়ে বানানো দ্রব্যাদি)৷

২) গমের তৈরি সব কিছু (রুটি, পাওরুটি, বিস্কুট যে কোন প্রকার, গম দিয়ে বানানো অন্যান্য দ্রবাদি)

৩) কোন প্রকার ডাল খাওয়া যাবে না

৪) আলু, মিষ্টি আলু, গাছ আলু বা আলু সাদৃশ্য অন্যান্য আলু, যা শর্করা জাতীয় সবজি যেমনঃ মূলা।

৫) এছাড়া চিনি এবং চিনি দিয়ে বানানো দ্রব্যাদি পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা খাওয়া যাবে না।

৬) দই, টক দই, দুধ এবং সরাসরি দুধ দিয়ে বানানো দ্রবাদি।

৭) মধু, এবং মিষ্টি ফলমূল খাওয়া যাবে না। কেন খাওয়া যাবেনা সেটা পরে ব্যাখ্যা করছি।

৮) সয়াবিন তৈল, সূর্য মুখী তেল, রাইস ব্যান ওয়েল, ক্যানোলা ওয়েল, এবং সাধারণ কোন তেলে রান্না করা কিছু খাওয়া যাবে না৷

৯) ফার্মের মুরগি, যে মুরগী গুলো টেনারির বর্জ্য থেকে উৎপাদিত খাদ্য খাওয়ানো হয়, সয়া খাওয়ানো হয় ।

১০) গরুর মাংস, যে গরু বা ষাঁড় গুলো ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মোটা তাজা করা হয়। খাসির ব্যাপারেও একই কথা।

যা খেতে বাঁধা নেইঃ

১) সবুজ শাক, সবজি৷ (গাজর, কচি সবুজ মিষ্টি কুমড়া খেলে অল্প পরিমাণ)

২) টক জাতীয় ফল। যেমন, জলপাই, আমলকী, একটি কচি ডাবের পানি।

৩) মাছ, যে কোন প্রকার খেতে পারবেন৷ তবে তৈলাক্ত দেশিয় মাছের ভেতর পাংকাশ, বোয়াল, ইলিশ সরপুঁটি, ব্রীগেড, গ্রাসকার্প, বাইম মাছ উত্তম৷ তৈলাক্ত বা সাগরের মাছ হলে আরো ভালো৷

৪) গরু এবং খাসির মাংস খাওয়া যাবে তবে তা হতে হবে ইঞ্জেকশান মুক্ত এবং ঘাস, লতা পাতা বা খড় কুটো খেয়ে লালিত পালিত৷ তবে বেশি পরিমাণে খাওয়া যাবে না৷

৫) গরু, বা খাসির পায়া খাওয়া যাবে। যেটা খাওয়া এই সময়ে খুবই উপকারী৷ এটাও অল্প পরিমানে খেতে হবে।

৬) মুরগির ডিম খেতে পারবেন৷ ফার্ম হলে সমস্যা নেই, তবে ওমেগা ৩ বা দেশী মুরগী বা হাস হলে বেশী ভালো৷

৭) মাছের ডিমও খেতে চেষ্টা করবেন যথা সম্ভব।

৮) ঘি, অর্গানিক বাটার, এক্সট্রা ভার্জিন ওলিভয়েল, MCT ওয়েল, অর্গানিক Extra virgin cold pressed কোকোনাট ওয়েল৷ এগুলো সব ভাল শপে পাওয়া যায়, তবে নিজে তৈরী করাটাই শ্রেয়।

৯) যে কোন প্রকার বাদাম। চিনাবাদাম, কাজুবাদাম, পেস্তা বাদাম, অন্যান্য বাদাম যা আছে৷ চাইলে বাদাম ব্লেন্ড করে সাথে উপরে উল্লেখিত নারকেল তেল দিয়ে বানাতে পারেন পিনাট বাটার৷ যেটা খেতে তুলনাহীন৷ তবে খাবেন অল্প পরিমাণে।

১০) রং চা বা কফি খেতে পারেন দুধ চিনি ছাড়া। গ্রীণ টি এর সাথে লেবু, আদা, সামান্য লবন মেশাতে পারেন। কফির সাথে, MCT ওয়েল, মাখন বা ঘি, এবং অর্গানিক কোকোনাট অয়েল মিশিয়ে বাটার কফি বানিয়ে খেতে পারেন৷ এতে ভালো কাজ হবে।

কিভাবে ডায়েট শুরু করবেন–

সকালের নাস্তাঃ

১) যাদের সকালে খাওয়ার অভ্যাস তারা আটটা বা সাড়ে আটটার দিকে দুধ চিনি ছাড়া এক কাপ চা খেতে পারেন৷ চায়ের মধ্যে যা দেবেন, আদা, লেবু, সামান্য লবন৷

২) এ্যপেল সিডার ভিনেগার বা কোকনাট ভিনেগার খেতে পারেন কুসুম গরম পানির সাথে৷

৩) এবং কুসুম গরম পানির সাথে লেবু চিপে খেতে পারেন।

সকাল আটটায় নাস্তা খেলে দেড়টার ভেতর দুপুরের খাবার খেতে হবে। এছাড়া যাদের দেরিতে নাস্তা খাওয়ার অভ্যাস তারা এগারোটার দিকে উপরোক্ত পদ্ধতিতে নাস্তা করবেন এবং দুপুরের খাবার আড়াইটা তিনটায় খাবেন।

দুপুরের খাবারঃ

১) দুপুরের খাওয়ার আগে অবশ্যই এ্যাপেল সিডার ভিনেগার এক চামচ এক গ্লাস পানির সাথে মিশিয়ে খাবেন। এতে আপনার গ্যাসের সমস্যা হবে না এবং চর্বি কাটতে সাহায্য করবে।

২) দুপুরের খাবারের ম্যানুতে শাক, সবজি, মাছ অথবা মাংস , ঘি এ ভাজা ডিম, ঘি’য়ে ভাজা বাদাম সাথে বাটার রাখতে পারেন এবং অবশ্যই টমেটো, গাজরসহ শসা বা শসার সালাদ রাখবেন ।

৩) শাক, সবজি অবশ্যই এক্সট্রা ভার্জিন ওলিভয়েল দিয়ে রান্না করবেন৷ মাছ ভাজলে (ডীপ ফ্রাই থেকে বিরত থাকবেন এতে খাদ্যগুন নস্ট হয়) বা রান্না করলে এই তেল দিয়েই করবেন। সবজি যতটুকু সম্ভব কম সেদ্ধ করবেন। যেন সবজির গুণগত মান ঠিক থাকে।

৪) ডিম কুসুম সহ ঘি বা মাখন দিয়ে ভেজে খাবেন। এক দিনে সর্বোচ্চ ছয়টা ডিম কুসুম সহ খেতে পারবেন কোন সমস্যা নেই। কারণ ডিম প্রোটিন এবং ভালো ফ্যাটের উৎস তবে একবার ফ্যাট এ্যাডাপটেশন হয়ে গেলে চাইলেও এত খেতে পারবেন না।

৫) দেশি মুরগি খেতে পারেন, এক দুই টুকরো অথবা উল্লিখিত গরুর মাংস । মাছ খেলে মাংস খাবেন না। মাংস খেলে মাছ খাবেন না। তবে প্রবাসে অবস্থানকরীগণ ফার্মের মুরগি এক টুকরো করে খেতে পারেন৷ কারণ সেখানে ফার্মের মুরগিকে আদর্শ খাবার খাওয়ানো হয় (যদিও মুরগী ব্যায়াম করে না যেটা দেশী মুরগী করে )।

৬) দুম্বা, উট, ভেড়ার মাংস খেলে এক টুকরোর বেশি নয়।

বিকেলের নাস্তাঃ

বিকেলে ক্ষুধা লাগলে উপরে উল্লেখিত চা, বাটার কফি এবং বাদাম খাবেন যে কোন প্রকার মাখন বা ঘি দিয়ে ভাজা বা মেশানো।

রাতের খাবারঃ

১) রাতের খাবারের পূর্বেও ভিনিগার মিশ্রিত এক গ্লাস পানি খেয়ে নিবেন৷

২) রাতের খাবার দুপুরের অনুরূপ খাবেন। আইটেম দুই একটা কম বেশি হোক কোন সমস্যা নেই।

৩) রাত আটটার আগেই সমস্ত খাবার শেষ করুন। এরপর আর পানি ছাড়া কিছুই খাবেন না।

যে বিষয় গুলো মানতেই হবেঃ

১) রাত দশটা বা সর্বোচ্চ এগারোটার ভেতর আপনাকে ঘুমিয়ে যেতে হবে৷ কারণ রাত দশটা থেকে দুইটার ভেতর আমাদের শরীরে গ্রোথ হরমোন নি:সরন হয়৷ এবং এই গ্রোথ হরমোনগুলো ফ্যাট বার্নিং এ প্রচুর সহায়তা করে। আপনি যদি এই প্রাকৃতিক বিষয়টি অগ্রাহ্য করেন তবে আপনার ডায়েট অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং ভাল ফল পেতে ব্যর্থ হবেন।

২) খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠবেন৷ নামাজ পড়ে (মুসলমানেরা) হাঁটতে বের হবেন৷ খালিপেটে হাটা ফ্যাট বার্ণিং এর জন্য অত্যান্ত কার্যকরী । হাঁটার গতি নির্ভর করবে আপনার বয়স অনুসারে। বয়স যদি চল্লিশের উর্ধ্বে হয় স্বাভাবিক গতিতে হাঁটুন ৪০/৬০ মিনিট। বয়স যদি চল্লিশের নিচে হয় তবে জগিং করুন নয়তো জোরে জোরে হাঁটুন ৪০/৬০ মিনিট। তবে খেয়াল রাখবেন হাঁটতে হাঁটতে যেন হাঁপিয়ে না যান বা শ্বাস কষ্ট না হয়। যতটুকু হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন শরীরের সাথে মানিয়ে করুন।

৩) দ্রুত মেদ ভুরি কমানোর জন্য ইয়োগা করতে পারেন৷ ইয়োগা করার পদ্ধতি YouTube এ দেখে নিন৷

৪) উপরে লিখিত পদ্ধতিতে সাত থেকে আট দিন নিয়ম করে চলুন। এই সময়টায় আপনার শরীর ফ্যাট বার্নিং বা চর্বি গলাতে শিখে যাবে৷ এটা হচ্ছে আপনার ডায়েটিং এর প্রথম ধাপ৷

৫) এবার দ্বিতীয় ধাপে শুরু করুন রোজা রাখা৷ সেহরীতে শুধু পানি খেয়ে রোজা রাখা আরম্ভ করুন৷ স্বাভাবিক রোজার মতো দিনে পানি এবং সমস্ত কিছু খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৬) ইফতার করবেন বাদাম, মাখন এবং শসা দিয়ে৷ সাথে অন্যান্য সালাদ কিংবা টক ফল রাখতে পারেন ।

৭) ভিনেগার মিশ্রিত পানি খেয়ে রাতের খাবার উপরে উল্লিখিত অনুরূপ খাবেন এবং অবশ্যই আটটার আগে সমস্ত খাবার শেষ করুন। বেশী ভালো ফল পেতে ইফতারের এক ঘন্টার ভেতর খাবার শেষ করুন এরপর পানি খেতে থাকুন।

৮) রোজা রাখা শুরু করলে বসা থেকে দাঁড়াতে মাথা সামান্য ঘুরতে পারে৷ সেক্ষেত্রে সামান্য লবন মিশ্রিত পানি খাবেন প্রতিদিন৷ এছাড়া ডাবের পানি খেতে পারেন৷ প্রতিদিন একটি কচি ডাব খাওয়া খুবই জরুরী।

৯) একটানা যতগুলো ফাস্টিং (রোজা) করতে পারবেন আপনি তত দ্রুত ফল পেতে থাকবেন। তবে ৭ দিন পর দুইদিন রোজা বিরতি দিবেন৷ ঐ দুইদিনও দুইবেলা খাবেন চার ঘন্টার ব্যাবধানে৷ খাদ্য মেনু আগেরগুলাই৷ বাকী সময় ওয়াটার ফাস্টিং করবেন৷ অর্থাৎ ভিনেগার, লেবু, গ্রীন টি, লবন মিশ্রিত পানি এগুলো খাবেন৷

১০) যদি এক টানা রোজা রাখতে না পারেন তবে সপ্তাহে অন্তত দুইটা করে রোজা রাখুন৷ আর যাদের পুরো দিনে রোজা রাখতে সমস্যা আছে তারা উপরের ম্যানুগুলো অনুসরণ করে খাদ্যবিরতির সময়টা দীর্ঘ করবেন৷ অর্থাৎ আংশিক ফাস্টিং করে যাবেন৷ দুইবেলা খাবেন চার ঘন্টার ব্যাবধানে৷ খাদ্য মেনু আগেরগুলাই৷ বাকী বিশ ঘন্টা ওয়াটার ফাস্টিং করবেন৷ অর্থাৎ ভিনেগার, লেবু, গ্রীন টি, লবন মিশ্রিত পানি এগুলো খাবেন৷ সে সাথে নিয়মিত হাঁটুন এবং ব্যায়াম করুন। আশা করা যায় দেড়, দুই মাসের ভেতরেই আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছেন।

আরো কিছু বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়ঃ

১) যতটুকু সম্ভব টেনশন ফ্রী থাকার চেষ্টা করবেন।

২) হাসি খুশি থাকবেন।

৩) প্রতিদিন হাঁটার সময় বা হাঁটার পরে সকালের স্নিগ্ধ রোদ গায়ে লাগানোর চেষ্টা করবেন৷ কারণ রোদে থাকা ভিটামিন ডি আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

৪) রাত আটটার ভেতর সমস্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যাবহার থেকে বিরত থাকুন এতে করে আপনার ঘুমের কোয়ালিটি ভালো হবে।

৫) মুসলমান হলে নিয়মিত নামাজ পড়বেন৷ বেশী বেশী নফল নামাজ পড়বেন৷ এতে আপনার ফরজ আদায় হওয়ার পাশাপাশি শারীরিক কিছু ব্যায়াম হবে৷ যা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। অন্য ধর্মের হলে নিজ নিজ ধর্মের রীতি অনুসারে ইবাদত করুন৷ আর সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস রাখুন এবং ভরসা রাখুন৷ অবশ্যই আপনি সফলকাম হবেন।

৬) বাহিরের সকল খাবার পরিহার করুন৷

৭) তরকারির জন্য প্যাকেটজাত মসলা না কিনে নিজেরা গোটা মসলা মেশিনে ভাঙ্গিয়ে নিন৷ সকল প্রকার প্যাকেটজাত দ্রব্য পরিহার করার চেষ্টা করুন৷

৮) রান্নায় সয়াবিন তেলের পরিবর্তে এক্সটা ভার্জিন অলিভওয়েল ব্যবহার করতে না পারলে আপাতত মন্দের ভালো হিসেবে শরিষার তৈল ব্যবহার করুন৷ সেটাও প্যাকেটজাত না কিনে পারলে নিজেরা মেশিনে প্রক্রিয়া করে তৈরি করে নিন৷

এ চার্ট কতদিন অনুসরণ করবেন?

অনেকে ভয় দেখান কিটো ডায়েট চার্ট দীর্ঘ মেয়াদে অনুসরণ করলে শরীরের ক্ষতি হয়৷ আমি বলি এটি সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য ফলো করুন৷ এর মধ্যেই আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন৷ অর এটি শুরু করে ছেড়ে দেয়া উচিত না৷ আপনি ভালোভাবে ভেবে যদি মনে করেন যে এটি ফলো করা আপনার দ্বারা সম্ভব তবেই আপনি শুরু করুন৷ আর মনে রাখবেন, সমস্ত বিষয়টি একটি প্যাকেজ প্রোগ্রাম। আপনি যতটুকু মেনে চলবেন ঠিক ততটুকু ফল পাবেন।

কিটোর পরে স্তর কী?

উপরোক্ত ডায়েট চার্টটি তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা নতুনভাবে শুরু করছেন৷ যারা ইতিমধ্যে শরীরের চর্বি গলিয়ে ফেলেছেন তাদের জন্য ভিন্ন ডায়েট চার্ট রয়েছে৷ আপাতত এতটুকু বলছি যে, তিন মাস এ চার্ট অনুরসণ করে আপনার কাঙ্ক্ষাত ফলাফল অর্জনের পর স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া করতে পারবেন৷ তবে সেটা আপনার পূর্বের অভ্যাসমতো করবেন না৷ ভাত, রুটি স্বল্প পরিমাণে খাবেন৷ অর্থাৎ শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট খুব কম না আবার পূর্বের ন্যায় খুব বেশিও গ্রহণ করবেন না৷ আর বাহিরের খাবার, খারাপ তেল, খারাপ চর্বি ইত্যাদি সর্বদাই পরিত্যজ্য৷ আর যারা অতিরিক্ত চিকনা পাতলা অর্থাৎ শরীরে কোনো চর্বি নাই এবং মোটা হতে চাচ্ছেন তাদের জন্য ডায়েট চার্ট অন্যটা৷

অনেক প্রচেষ্টার পরও সফলতা আসে না কেন?

সামান্য ভুলের কারণেই আমাদের অনেকে কঠোর ডায়েট ও কঠোর ব্যায়াম করার পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল পান না৷ আমি অনুরোধ করবো উপরে উল্লিখিত খাবারের বাইরে ডায়েট অবস্থায় আর অন্য কোন কিছুই খাবেন না। এখন বুঝিয়ে বলছি উৎকৃষ্ট খাবার মধু এবং মিষ্টি ফল কেন খাওয়া যাবে না। মধু এবং মিষ্টি ফলে আছে চিনি যা শর্করা হিসাবে আমাদের শরীর তা গ্রহন করে। আপনি যখন ডায়েট শুরু করবেন তখন শর্করা জাতীয় খাদ্য না খাওয়ায় শরীরে শর্করার ঘাটতি দেখা দিবে৷ তখন শরীর গ্লাইকোজেন পোড়াবে৷ এরপর শরীরের গ্লাইকোজেন শেষ হয়ে গেলে আমাদের শরীর তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় শরীরে জমে থাকা চর্বি গলিয়ে সেখান থেকে শক্তি গ্রহন করবে। কই’য়ের তেল দিয়ে কই ভাজার মতো। একেই বলে ফ্যাট এ্যাডাপটেশন। এখন যদি আপনি মধু, মিষ্টি ফল, চিনি জাতীয় শর্করা খাবার খান তবে আপনার শরীর ফ্যাট বার্নিং না করে এখান থেকেই তার প্রয়োজনীয় শক্তি গ্রহণ করবে। যার ফলশ্রুতিতে আপনার ফ্যাট বার্নিংও হবে না এবং আপনার স্বাস্থ্য এবং ডায়াবেটিসও কন্ট্রোলে থাকবে না। এ কারণেই ডায়েট অবস্থায় সমস্ত প্রকার শর্করা, মধু , মিষ্টি ফল, চিনি খেতে নিষেধ করা হয়। ডায়েট অবস্থায় আপনি যদি একটা মিষ্টি খান, দুই তিনটা মিষ্টি ফল খান, এক চামচ চিনি বা মধু খান, এক বেলা ভাত বা রুটি খান তবে আপনার শরীর ৪৮ ঘন্টার জন্য ফ্যাট বার্নিং বন্ধ করে দিবে। এ সকল সামান্য ভুলের কারণেই আমাদের অনেকে কঠোর ডায়েট ও কঠোর ব্যায়াম করার পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল পান না৷

শরীরে অতিরিক্ত চর্বি কীভাবে জমে?

শর্করা বা কার্ব আমিষ, প্রোটিন, ফ্যাট বা চর্বি আমাদের খাদ্য তালিকায় নৈমিত্তিক ব্যাপার। খাওয়ার পরে শর্করা রক্তে আসে চিনি হিসেবে, প্রোটিন আসে এ্যামাইনো এসিড হিসাবে, আর ফ্যাট আসে ফ্যাটি এসিড হিসাবে। শর্করা খাবারের পরে সেটা চিনিতে পরিণত হয়ে রক্তে আসে পাকস্থলী থেকে৷ আর ইনসুলিন এর মাধ্যমে রক্ত থেকে চিনি কোষের ভেতর চলে যায়৷ আর আপনি যদি কঠিন ব্যায়াম করেন বা বেশি পরিশ্রমের কাজ করেন তবে চিনিটা সরাসরি কোষের ভেতর প্রবেশ করে, ইনসুলিন এর মাধ্যম ছাড়াই গ্লুট ফোর পাথওয়ে দিয়ে । মানে হাটা/ব্যায়াম একটি ফ্রী চিকিৎসা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য।

প্রোটিন আমাদের শরীরে মাংস পেশি গঠনে সাহায্য করে। আর ফ্যাট ছাড়া আমাদের চলেই না। আমাদের মস্তিষ্ক ফ্যাটের তৈরি, আমাদের গুরুত্বপূর্ন হরমোন গুলো ফ্যাটের তৈরি৷ যেমন টেস্টোসটেরন, আমাদের নার্ভের কাভারিং গুলো ফ্যাটের তৈরি। যারা বলছেন ফ্যাট খাবেন না, তারা আসলে ভুল বলছেন। আর যারা বাজে তেল প্রতিনিয়ত খাচ্ছেন তারা নিজের অজান্তে নিজের কত বড় সর্বনাশ করছেন তা যদি জানতেন তবে কেউ মেরে ফেলার হুমকি দিয়েও বাজে তেল আপনাদের খাওয়াতে পারতো না ।

আমরা যখন চিনি জাতীয় বা শর্করা জাতীয় খাবার খাচ্ছি সেটা তখন আমাদের শরীরে ATP বা শক্তি উৎপন্ন করছে। প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন করার পর বাকিটুকু লিভার এবং মাসলে গ্লাইকোজেন হিসাবে শরীরে জমা করছে। আর এরপরও যেটা অতিরিক্ত থাকছে সেটা চর্বি হিসাবে শরীরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন স্থানে জমা থাকছে৷ দীর্ঘমেয়াদী অনেক রোগর কারণ হল এই জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি। অর্থাৎ আপনি যখন ভাত, রুটি, আলু ,গম বা চিনি জাতীয় কিছু খেলেন এবং পরিমাণে বেশী খেলেন তখন কিন্তু সেগুলো চর্বি হিসেবেই জমা হলো । খেলেন ভাত, রুটি আর সেটা হলো চর্বি । আর আপনি যদি প্রোটিন বেশি পরিমাণে খান তবে অতিরিক্তটুকুও কিন্তু চিনি হিসেবে শরীরে কনভার্ট হচ্ছে এবং পরে চর্বি হিসাবেই জমা হচ্ছে। ফ্যাটের ব্যাপারটাও প্রায় একই, এটা বেশি পরিমাণে খেলে যতটুকু শরীরের প্রয়োজন ব্যাবহার করবে বাকিটুকু সরাসরি চর্বি হিসাবে শরীরে জমা পড়ে থাকছে। এখন একটু হিসাব করে দেখুন আপনি অতিরিক্ত যাই খাচ্ছেন সবই কিন্তু শরীরে চর্বি বা ফ্যাট হিসাবে জমা হচ্ছে ।

ফ্যাট এ্যাডপটেশন প্রক্রিয়াঃ

এবার বলছি শরীরে ফ্যাট এ্যাডপটেশন (বা চর্বি গলিয়ে চলা) কিভাবে শুরু হয় এবং কিভাবে আপনার অনাকাঙ্ক্ষিত চর্বিগুলো গলাবেন । প্রথমে আপনাকে কী করতে হবে, শর্করা জাতীয় খাবার একেবারেই কমিয়ে ফেলতে হবে, কমছে কম ৫% থেকে ১০% এ নামিয়ে ফেলতে হবে। এর জন্য শাক সবজি ছাড়া কিছুই খেতে পারবেন না। কারণ এই ৫-১০% শর্করা আপনার শাক সবজি থেকেই আসবে অন্য কিছু থেকে নয়। এমন কি মিষ্টি ফল, আইসক্রিম, চুইংগাম, ভাত, রুটি, নুডুলস কিছুই খেতে পারবেন না আপাতত।

আর প্রোটিনের পরিমাণটা থাকতে হবে অল্প, মানে ২০% আর বাকিটা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট খেতে হবে। আপনাকে এখন জানতে হবে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট কোন গুলো। ডিমের কুসুম, নারিকেলের তেল, MCT oil, এক্সট্রা ভার্জিন ওলিভওয়েল, ওরগানিক কোকোনাট ওয়েল, মাছের তেল, মাছের ডিম, যে কোন প্রকার বাদাম, পিনাট বাটার (ঘরে তৈরী), আর মন্দের ভালো ঘানিতে ভাংগানো সরিষার তেল।

ফ্যাট এ্যাডপটেশন প্রক্রিয়াটি চালু করতে হলে, আপনাকে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হবে এবং ব্যায়াম করতে হবে৷ এতে আপনার শরীর কী করবে? শরীরে জমে থাকে চিনি শক্তি হিসেবে ব্যাবহার করবে৷ চিনি শেষ হয়ে গেলে শরীর বিশেষ প্রক্রিয়ায় গ্লাইকোজেন কে বার্ন করতে শুরু করবে। যখনই শরীরে জমে থাকা চিনি এবং গ্লাইকোজেন শেষ হয়ে যাবে তখন শুরু হবে আসল খেলা। বেচারা শরীর, তার চাহিদা পূরণের জন্য আপনার শরীরে জমে থাকা চর্বি গলাতে শুরু করবে৷ কারণ প্রথমেই বলেছি চর্বি হলো শক্তির আধার । আপনার অতিরিক্ত খাবারের শক্তি সেখানেই কিন্তু জমা হয়ে আছে। না খেয়ে থাকার আরেকটা উপকার হলো, আপনার শরীরে অটোফেজি শুরু হবে। অটোফেজি কী সেটা নিম্নে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ডায়েট শুরুর প্রথমেই না খেয়ে থাকা শুরু করবেন না। আপনার শরীরকে প্রস্তুত করুন। আপনার শরীরকে জানান দিন যে, এত দিন তো অখাদ্য, কুখাদ্য খেয়ে ভুঁড়ি আর শরীর বাড়িয়ে ফেলেছিস। এবার তোর সাইজ হবার পালা। তো সাত আট দিন শর্করা ৫-১০%, প্রোটিন ২০%, এবং উল্লেখিত ভালো ফ্যাট অধিক পরিমাণে খান, হাঁটুন এবং ব্যায়াম করতে থাকুন। এই কয়দিনে চিনি এবং গ্লাইকোজেনের স্টক ফুরিয়ে যাবে এবং ফ্যাট এ্যাডপটেশনের প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে যাবে। আর যখন আপনি ফাস্টিং শুরু করবেন বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকবেন তখন আপনার শরীরে চর্বি দ্রুত ভাঙতে শুরু করবে৷ আর তখনই এর মজাটা আপনি অনুভব করতে শুরু করবেন, কারণ তখন আপনার আর ক্ষুধা লাগবে না। দীর্ঘ সময় আপনি না খেয়ে থাকতে পারবেন।

অটোফেজি কীঃ

রোজা (ফাস্টিং) এর মাধ্যমে আপনার শরীরে অটোফেজি শুরু হবে। অটোফেজি হলো, এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শরীর তার খারাপ কোষকে খেয়ে ফেলে এবং সেখান থেকে নতুন কোষের সৃষ্টি করে। বসন্তের নতুন পাতা গজানোর মত; এতে দেখা যাবে আপনি নতুন করে জন্মগ্রহণ করছেন এবং আপনি আপনার হারানো তারুণ্য ফিরে পাচ্ছেন। কিছুদিনের ভেতর খেয়াল করবেন আপনার ক্ষুধা কমে গেছে। যারা বারবার খেতেন বা খেতে বাধ্য হতেন তাদেরও খেতে ইচ্ছে হবে না৷ এর কারণ হলো আমাদের শরীরে প্রচুর জমাকৃত চর্বি রয়েছে৷ সেখান থেকেই দেহ তার সমস্ত চাহিদা পূরণ করে নেয়া শুরু করবে৷ তাই আর বাড়তি খাবারের প্রয়োজন অনুভব হবে না। সেটা এক অন্যরকম অনুভূতি। আপনি না খেয়েও বেশ শক্তিশালী হবেন, আগে যেখানে খাবার খেয়েও দুর্বল হতেন । এই অনুভুতি বলে বোঝানোর মত না।

আর এছাড়া যারা ডায়াবেটিস এর রোগী আছেন তারা উল্লেখিত নিয়মাবলী ফলো করে তাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন৷ তবে ডায়েট শুরু করার আগে ডায়াবেটিস এর সমস্ত ওষুধ এবং ইনসুলিন বন্ধ করে দিতে হবে। তাদের ক্ষেত্রে টানা রোজা না রাখলেও চলবে। ডায়াবেটিস এর খুব বেশি জটিল রোগী হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তারপর শুরু করতে হবে। যাই করবেন বুঝে শুনে করতে হবে৷ নিয়মিত ডায়াবেটিস এবং প্রেশার মাপা খুবই জরুরী৷ কোন কোন খাবার কার্বোহাইড্রেট যুক্ত, কোন কোন খাবার প্রোটিন যুক্ত আর কোন কোন খাবার শর্করা সেটা জানাও জরুরী ।

শেষ কথাঃ

বাড়তি কিছু জানার থাকলে কমেন্ট ডাঃ জাহাঙ্গীর কবির এর ফেসবুক পেইজ বা ইউটিউব চ্যানেলে কমেন্ট করতে পারেন৷ আরো বিস্তারিত জানতে ডাক্তার সাহেবের ফেইজের পোস্টসমূহের কমেন্টে দেওয়া লিংকের ভিডিও গুলো দেখুতে পারেন। ডায়েট চার্ট অনুসরণ করুন, সুস্থ শরীর গড়ে তুলুন৷

[নতুন যারা ডায়েট শুরু করতে চাচ্ছেন এ চার্টটি তাদের জন্য। এ লেখাটির যাবতীয় তথ্য ডাঃ জাহাঙ্গীর কবির এর ফেসবুক পেইজ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে৷

কৃতজ্ঞতায় প্রিয় গল্পকার Azad Abul Kalam

Leave a Reply

You must be logged in to post a comment.

Editor in Chief: Dr. Omar Faruque

Contributing Correspondent: Shirley Chesney

Dhaka Office: Mazaharul Islam, & Pradip K Paul, London: Dr. Ahmed Hussain

All contact: 1366 White Plains Road, Apt. 1J, The Bronx, New York-10462

Mob. 001.347.459.8516
E-mail: dhakapost91@gmail.com